চট্টগ্রামে যুদ্ধাপরাধীদের নির্মূলে লড়াইয়ের শপথ


কাদের মোল্লাসহ সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে চট্টগ্রামে গণঅবস্থান কর্মসূচি তৃতীয় দিনে পরিণত হয় জনতার সমাবেশে।
আর সেই সমাবেশে জড়ো হওয়া হাজারো তরুণ লাখো শহীদের রক্তের নামে লড়াইয়ের শপথ নেন। সমাবেশের মূল দাবি একটাই, ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই।’

শুক্রবার দুপুরে বন্দরনগরীর জামালখান প্রেসক্লাব চত্বরে শুরু হয় অবস্থান কর্মসূচি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের ঢল। ঢোল-করতাল বাজিয়ে চলতে থাকে প্রতিবাদী গান, শুরু হয় শ্লোগান। গণ অবস্থান পরিণত হয় সমাবেশে।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে নগরীর চেরাগী পাহাড় থেকে জামাল খান মোড় পর্যন্ত শিক্ষক, ছাত্র, পেশাজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, রাজনৈতিককর্মী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এই এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
গানে, স্লোগানে, কবিতায়, বক্তব্যে, কার্টুনে ও গায়ের টি শার্টে লেখা দিয়ে দাবি জানানো হচ্ছে ঘাতক-যুদ্ধপরাধীদের ফাঁসির।
কর্মসূচি শুরু হয় উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী ও চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের গণসঙ্গীতের মধ্য দিয়ে।
বাঁধ ভেঙ্গে দাও, এ লড়াই বাঁচার লড়াই, পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল, জয় বাংলা বাংলার জয়সহ বিভিন্ন সংগীত এবং শ্লোগাণের মধ্য দিয়ে প্রকম্পিত হয়ে উঠে জামাল খান ও প্রেসক্লাব চত্বর। তারুণ্যের বাঁধভাঙ্গা জোয়ার যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিকে জোরালো ও প্রাণের দাবিতে পরিণত করেছে।
এরপর বিকেল পাঁচটায় সমাবেশে আসেন শহীদ জায়া বেগম মুশতারী শফী। তিনি হাজারো জনতাকে শপথ বাক্য পাঠ করান।
হাজারো প্রতিবাদী কণ্ঠে ধ্বনিত সেই শপথে বলা হয়, “স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতক-রাজাকার যুদ্ধাপরাধীদের এদেশের মাটি থেকে নির্মূলে নিজেদের সর্বশক্তি নিয়োগ করব। লাখো শহীদের রক্তের নামে শপথ করছি যে, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাব।”
“আমরা আরও শপথ করছি যে, শহীদ জননী জাহানার ইমামের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এবং ৯২ এর গণআদালতের গণ রায় প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত রাখব।”
শপথে বলা হয়, জামায়াত ইসলামীসহ সকল ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা এবং ধর্ম নিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আজীবন লড়াই চালিয়ে যাব। বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত।’
এরপর প্রতিবাদী শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। শ্লোগান ওঠে ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই, ‘মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার গর্জে ওঠো আরেকবার,’ ’জামায়াত শিবির রাজাকার এই মুর্হূতে বাংলা ছাড়।’, ‘ক তে কাদের মোল্লা, তুই রাজাকার, তুই রাজাকার।’
সমাবেশ স্থল ঘুরে দেখা গেছে, পুরো এলাকা প্রতিবাদী জনতার দখলে। কেউ গান গাইছেন, কেউ রাস্তায় আলপনা আঁকছেন আবার কেউ শ্লোগান তুলছেন। সমাবেশে আসা সব বয়সী মানুষের মাথায় বাঁধা জাতীয় পতাকা। কারো পরনে ফাঁসির দাবি সম্বলিত টিশার্ট।
নারী-পুরুষ, শিশু, বর্ষীয়ান মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয় সমাবেশ স্থল।
কর্মসূচিতে সংহতি জানায় আওয়ামী লীগ, সিপিবি, ওর্য়াকার্স পার্টি, বাসদ, জাসদ, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্রমৈত্রী, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম, ব্লগারস, রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজসহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, চারু শিল্পী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ।
ঢাকার শাহবাগের মতো চট্টগ্রামেরও জনতার এই কর্মসূচিতে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেননি আয়োজকরা।
বুধবার বিকালে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী তরুণ উদ্যোগ, কিছু তরুণ, কিছু অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও সংস্কৃতিকর্মীরা চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে প্রতিবাদী এ কর্মসূচি শুরু করেন।
এতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্তরের মানুষ অংশ নিয়ে এটিকে জনতার কর্মসূচিতে পরিণত করেন।
জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন সাজার রায় প্রত্যাখ্যান করে মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে বিক্ষোভের সূচনা করে ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম। এরপর তা পরিণত হয় জনতার সমাবেশে।
চট্টগ্রামে বুধবার থেকে জামালখান প্রেসক্লাব চত্বরে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচি শুরু হয়।

Comments

Popular posts from this blog

যুদ্ধাপরাধের বিচার: জাতি কি এই রায়ের জন্য অপেক্ষা করেছিল?

ঈদের পর নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল, জামায়াতের হরতাল