যুদ্ধাপরাধের বিচার: জাতি কি এই রায়ের জন্য অপেক্ষা করেছিল?
গণহত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ার পরও কেন আন্তর্জাতিক
অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ জামায়াতের নেতা ও একাত্তরের নৃশংস হন্তারক কাদের
মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করলেন, আইনের ছাত্র হিসেবে আমি তার
কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। ট্রাইব্যুনালের বিচারকেরা ফৌজদারি
ন্যায়বিচার-ব্যবস্থার নীতিমালার কথা বললেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের নৃশংসতা
এবং অপরাধীদের শাস্তির নিশ্চয়তা বিধানের কথা বললেন, অপরাধ ও শাস্তির
সমানুপাতিকতার (Proportionality) কথা বললেন। কিন্তু এত এত নীতিমালা, উচ্চ
আদালতের রায়ের উদ্ধৃতি ও আইনি আদর্শের কথা বলার পর কী করে ট্রাইব্যুনালের
বিচারকেরা কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করলেন? যেখানে
বিচারকেরা নিজেরাই বলছেন যে ছয়টি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিই সন্দেহাতীতভাবে
প্রমাণিত হয়েছে।
যে পাঁচটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে: পল্লব হত্যা, কবি মেহেরুননিসা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা, সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব হত্যা, আলুব্দীতে তিন শতাধিক মানুষের হত্যাকাণ্ড, হযরত আলীসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা ও ধর্ষণ। বিচারকেরা তাঁদের রায়ে বলেছেন যে ব্যক্তি হত্যা, গণহত্যা ও ধর্ষণ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাঁরা রায়ে আরও বলছেন যে অপরাধীর শাস্তি হতে হবে অপরাধের সমানুপাতিক। তারপর ইতিহাসের ভয়াবহ হন্তারক কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করলেন। এ রায়কে কীভাবে বিচারকেরা যুক্তিগ্রাহ্য করবেন? আইনের ছাত্র, শিক্ষক, বিচারক, আইনজীবীরা কীভাবে এ রায়কে আইনসংগত বলে মেনে নেবেন? মুক্তিযোদ্ধারা এবং দেশবাসী কীভাবে আশ্বস্ত হবে যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে?
১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ২০ অনুচ্ছেদের (২) নম্বর উপ-অনুচ্ছেদে যা লেখা আছে, তার বাংলা তরজমা করলে যে মানে দাঁড়ায়, সেটি হচ্ছে, একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত হলে ট্রাইব্যুনাল অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড বা অন্য যেকোনো দণ্ড প্রদান করতে পারবেন। তবে দণ্ডটি অবশ্যই অপরাধের নৃশংসতা ও ভয়াবহতার সঙ্গে সমানুপাতিক বা সাযুজ্যপূর্ণ হতে হবে, যেটিকে ট্রাইব্যুনাল যুক্তিযুক্ত ও যথার্থ বলে মনে করেন। বাংলাদেশের পেনাল কোড বা দণ্ডবিধি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ যদি অন্য কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করে এবং সেটি যদি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়, তাহলে হত্যাকারীদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী, কোনো নারী ধর্ষিতা হলে এবং ধর্ষণ-পরবর্তী অন্যান্য কার্যকলাপের কারণে ধর্ষিত নারীর মৃত্যু হলে দায়ী ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।
স্বাভাবিক সময়েও কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত হত্যা বা ধর্ষণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলে নিয়মিত ফৌজদারি আদালত অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে থাকেন। আর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ যুদ্ধকালীন সংঘটিত গণহত্যা, মানবতা ও শান্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার করছেন। বিচারের রায়ে বিচারকেরা বলছেন, কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ব্যক্তি হত্যা, পারিবারিক হত্যা, ধর্ষণ ও গণহত্যা (আলুব্দীতে তিন শতাধিক ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড) সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। অথচ এ জন্য তাঁরা কাদের মোল্লাকে দুটি অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং তিনটি অপরাধে ১৫ বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করলেন। কী করে তাহলে শাস্তি অপরাধের সমানুপাতিক হলো? আইনের ছাত্র হিসেবে এ কথা বলা কি অন্যায় হবে যে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ২০(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রায়টি যথাযথ হয়নি? কাদের মোল্লার নৃশংসতা, নিষ্ঠুরতা ও হিংস্রতা সম্পর্কে যাঁরা জানেন, যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা, যাঁরা স্বজন হারিয়েছেন, তাঁদের পক্ষ থেকে কাদের মোল্লার একাধিক মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করা হলে সেটা কি খুব অন্যায় হবে? অর্থাৎ প্রতিটি অভিযোগে আলাদা আলাদা দণ্ড দেওয়া। অথচ বিচারকেরা কাদের মোল্লাকে একটি অভিযোগেও মৃত্যুদণ্ড দিলেন না! আলুব্দী গ্রামে স্বজন হারানো ব্যক্তিরা কান্নায় ভেঙে পড়লেন, হতাশা ও ক্ষোভে মর্মাহত হলেন মুক্তিযোদ্ধারা, তরুণ প্রজন্ম দ্রোহ ও প্রতিবাদে রাজপথে নেমে এল আর আমরা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম—৪১ বছর পরেও ন্যায়বিচার অধরাই থেকে গেল! বাঙালি জাতি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখল, যারা গণহত্যা ও ধর্ষণ করতে পারে, যারা মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জারজ সন্তান’ বলে আখ্যা দিতে পারে, যারা বাংলাদেশে বসবাস করেও মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতে পারে, যারা যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচাল করার জন্য নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে, তারা এই রায়ে খুশি হয়ে ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়েছে। এই রায় মহান মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা স্বজন হারিয়েছেন, তাঁদের কান্না মোছাতে পারেনি। তাঁরা ন্যায়বিচার পাননি।
বিচারকেরা তাঁদের রায়ে বলেছেন, ‘সমানুপাতিকতার নীতির অর্থ হচ্ছে দণ্ডের মধ্য দিয়ে সমানুপাতিকতার মানটিকে প্রতিফলিত হতে হবে। অর্থাৎ অপরাধের নৃশংসতার সঙ্গে অপরাধীর দায়িত্বের মাত্রাগত সম্পর্ক থাকতে হবে। অপরাধের নৃশংসতা (ব্যাপকতা) নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আমরা অপরাধী কীভাবে এবং কোনো মাত্রায় অপরাধ সংঘটনে অংশ নিয়েছে, তা আমলে নিয়েছি।’
ট্রাইব্যুনালের বিচারকেরা রায়ের উপসংহারে এসে বললেন, ‘শত শত দোষী ব্যক্তি অব্যাহতি পেয়ে যাক, কিন্তু একজন নির্দোষ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পায়’—ফৌজদারি ন্যায়বিচার-ব্যবস্থার এই নীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তন এসেছে। এ ব্যাপারে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, ‘একটি ফৌজদারি মামলায় একজন বিচারক এ জন্য বসেন না যে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পায়, একজন বিচারক এ জন্যও বসেন, যাতে কোনো অপরাধী শাস্তির হাত থেকে রেহাই না পায়।’
ফৌজদারি ন্যায়বিচার-ব্যবস্থার নীতিমালা বিশ্লেষণ, মানবতাবিরোধী অপরাধের ভয়াবহতা ও নৃশংসতা বিষয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা ও আইন ব্যাকরণের কিছু বিষয়ের ওপর আলো প্রক্ষেপণের পর ট্রাইব্যুনালের বিচারকেরা যখন রায়টি প্রদান করলেন, আমরা তখন হতবাক। ট্রাইব্যুনাল কক্ষে আইনজীবী, মুক্তিযোদ্ধা, সুশীল সমাজের সদস্যসহ আমরা যারা উপস্থিত ছিলাম, সবাই ক্ষুব্ধ, হতাশ ও মর্মাহত। কাদের মোল্লা তখন ট্রাইব্যুনালের মধ্যে আস্ফাালন করছিলেন (বিচারকেরা ততক্ষণে এজলাস ছেড়ে চলে গেছেন।) হায় বাংলাদেশ! ’৭১ সালেও কাদের মোল্লারা আস্ফাালন করেছেন। ৪১ বছর পরেও তাঁরা আস্ফাালন করেই চলেছেন।
এই বিচারের ক্ষেত্রে তদন্ত দল বা প্রসিকিউশনের কোনো ব্যর্থতা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
পরিশেষে দুটি প্রস্তাব। এক. যে অভিযোগে কাদের মোল্লা অব্যাহতি পেয়েছেন, তার বিরুদ্ধে আপিল করে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিতের সর্বাত্মক চেষ্টা রাষ্ট্রপক্ষ করবে। দুই. বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যাপারে তৃতীয় একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ওই ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা যেতে পারে। কেননা, একাত্তরে কাদের মোল্লারা কেবল সাধারণ মানুষ হত্যা করেননি, হত্যা করেছেন মেহেরুননিসার মতো কবি এবং খন্দকার আবু তালেবের মতো সাংবাদিককে।
শেখ হাফিজুর রহমান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ও অপরাধবিজ্ঞান গবেষক।
hrkarzon@yahoo.com
যে পাঁচটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে: পল্লব হত্যা, কবি মেহেরুননিসা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা, সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব হত্যা, আলুব্দীতে তিন শতাধিক মানুষের হত্যাকাণ্ড, হযরত আলীসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা ও ধর্ষণ। বিচারকেরা তাঁদের রায়ে বলেছেন যে ব্যক্তি হত্যা, গণহত্যা ও ধর্ষণ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাঁরা রায়ে আরও বলছেন যে অপরাধীর শাস্তি হতে হবে অপরাধের সমানুপাতিক। তারপর ইতিহাসের ভয়াবহ হন্তারক কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করলেন। এ রায়কে কীভাবে বিচারকেরা যুক্তিগ্রাহ্য করবেন? আইনের ছাত্র, শিক্ষক, বিচারক, আইনজীবীরা কীভাবে এ রায়কে আইনসংগত বলে মেনে নেবেন? মুক্তিযোদ্ধারা এবং দেশবাসী কীভাবে আশ্বস্ত হবে যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে?
১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ২০ অনুচ্ছেদের (২) নম্বর উপ-অনুচ্ছেদে যা লেখা আছে, তার বাংলা তরজমা করলে যে মানে দাঁড়ায়, সেটি হচ্ছে, একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত হলে ট্রাইব্যুনাল অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড বা অন্য যেকোনো দণ্ড প্রদান করতে পারবেন। তবে দণ্ডটি অবশ্যই অপরাধের নৃশংসতা ও ভয়াবহতার সঙ্গে সমানুপাতিক বা সাযুজ্যপূর্ণ হতে হবে, যেটিকে ট্রাইব্যুনাল যুক্তিযুক্ত ও যথার্থ বলে মনে করেন। বাংলাদেশের পেনাল কোড বা দণ্ডবিধি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ যদি অন্য কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করে এবং সেটি যদি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়, তাহলে হত্যাকারীদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী, কোনো নারী ধর্ষিতা হলে এবং ধর্ষণ-পরবর্তী অন্যান্য কার্যকলাপের কারণে ধর্ষিত নারীর মৃত্যু হলে দায়ী ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।
স্বাভাবিক সময়েও কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত হত্যা বা ধর্ষণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলে নিয়মিত ফৌজদারি আদালত অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে থাকেন। আর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ যুদ্ধকালীন সংঘটিত গণহত্যা, মানবতা ও শান্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার করছেন। বিচারের রায়ে বিচারকেরা বলছেন, কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ব্যক্তি হত্যা, পারিবারিক হত্যা, ধর্ষণ ও গণহত্যা (আলুব্দীতে তিন শতাধিক ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড) সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। অথচ এ জন্য তাঁরা কাদের মোল্লাকে দুটি অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং তিনটি অপরাধে ১৫ বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করলেন। কী করে তাহলে শাস্তি অপরাধের সমানুপাতিক হলো? আইনের ছাত্র হিসেবে এ কথা বলা কি অন্যায় হবে যে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ২০(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রায়টি যথাযথ হয়নি? কাদের মোল্লার নৃশংসতা, নিষ্ঠুরতা ও হিংস্রতা সম্পর্কে যাঁরা জানেন, যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা, যাঁরা স্বজন হারিয়েছেন, তাঁদের পক্ষ থেকে কাদের মোল্লার একাধিক মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করা হলে সেটা কি খুব অন্যায় হবে? অর্থাৎ প্রতিটি অভিযোগে আলাদা আলাদা দণ্ড দেওয়া। অথচ বিচারকেরা কাদের মোল্লাকে একটি অভিযোগেও মৃত্যুদণ্ড দিলেন না! আলুব্দী গ্রামে স্বজন হারানো ব্যক্তিরা কান্নায় ভেঙে পড়লেন, হতাশা ও ক্ষোভে মর্মাহত হলেন মুক্তিযোদ্ধারা, তরুণ প্রজন্ম দ্রোহ ও প্রতিবাদে রাজপথে নেমে এল আর আমরা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম—৪১ বছর পরেও ন্যায়বিচার অধরাই থেকে গেল! বাঙালি জাতি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখল, যারা গণহত্যা ও ধর্ষণ করতে পারে, যারা মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জারজ সন্তান’ বলে আখ্যা দিতে পারে, যারা বাংলাদেশে বসবাস করেও মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতে পারে, যারা যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচাল করার জন্য নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে, তারা এই রায়ে খুশি হয়ে ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়েছে। এই রায় মহান মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা স্বজন হারিয়েছেন, তাঁদের কান্না মোছাতে পারেনি। তাঁরা ন্যায়বিচার পাননি।
বিচারকেরা তাঁদের রায়ে বলেছেন, ‘সমানুপাতিকতার নীতির অর্থ হচ্ছে দণ্ডের মধ্য দিয়ে সমানুপাতিকতার মানটিকে প্রতিফলিত হতে হবে। অর্থাৎ অপরাধের নৃশংসতার সঙ্গে অপরাধীর দায়িত্বের মাত্রাগত সম্পর্ক থাকতে হবে। অপরাধের নৃশংসতা (ব্যাপকতা) নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আমরা অপরাধী কীভাবে এবং কোনো মাত্রায় অপরাধ সংঘটনে অংশ নিয়েছে, তা আমলে নিয়েছি।’
ট্রাইব্যুনালের বিচারকেরা রায়ের উপসংহারে এসে বললেন, ‘শত শত দোষী ব্যক্তি অব্যাহতি পেয়ে যাক, কিন্তু একজন নির্দোষ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পায়’—ফৌজদারি ন্যায়বিচার-ব্যবস্থার এই নীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তন এসেছে। এ ব্যাপারে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, ‘একটি ফৌজদারি মামলায় একজন বিচারক এ জন্য বসেন না যে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পায়, একজন বিচারক এ জন্যও বসেন, যাতে কোনো অপরাধী শাস্তির হাত থেকে রেহাই না পায়।’
ফৌজদারি ন্যায়বিচার-ব্যবস্থার নীতিমালা বিশ্লেষণ, মানবতাবিরোধী অপরাধের ভয়াবহতা ও নৃশংসতা বিষয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা ও আইন ব্যাকরণের কিছু বিষয়ের ওপর আলো প্রক্ষেপণের পর ট্রাইব্যুনালের বিচারকেরা যখন রায়টি প্রদান করলেন, আমরা তখন হতবাক। ট্রাইব্যুনাল কক্ষে আইনজীবী, মুক্তিযোদ্ধা, সুশীল সমাজের সদস্যসহ আমরা যারা উপস্থিত ছিলাম, সবাই ক্ষুব্ধ, হতাশ ও মর্মাহত। কাদের মোল্লা তখন ট্রাইব্যুনালের মধ্যে আস্ফাালন করছিলেন (বিচারকেরা ততক্ষণে এজলাস ছেড়ে চলে গেছেন।) হায় বাংলাদেশ! ’৭১ সালেও কাদের মোল্লারা আস্ফাালন করেছেন। ৪১ বছর পরেও তাঁরা আস্ফাালন করেই চলেছেন।
এই বিচারের ক্ষেত্রে তদন্ত দল বা প্রসিকিউশনের কোনো ব্যর্থতা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
পরিশেষে দুটি প্রস্তাব। এক. যে অভিযোগে কাদের মোল্লা অব্যাহতি পেয়েছেন, তার বিরুদ্ধে আপিল করে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিতের সর্বাত্মক চেষ্টা রাষ্ট্রপক্ষ করবে। দুই. বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যাপারে তৃতীয় একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ওই ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা যেতে পারে। কেননা, একাত্তরে কাদের মোল্লারা কেবল সাধারণ মানুষ হত্যা করেননি, হত্যা করেছেন মেহেরুননিসার মতো কবি এবং খন্দকার আবু তালেবের মতো সাংবাদিককে।
শেখ হাফিজুর রহমান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ও অপরাধবিজ্ঞান গবেষক।
hrkarzon@yahoo.com
Comments
Post a Comment