জেগে ওঠো বাংলাদেশ
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের একটি রায় গোটা বাংলাদেশকে দাঁড়
করিয়ে দিয়েছে সত্যের মুখোমুখি। এ থেকে আমাদের আর পেছনে ফেরার উপায় নেই।
সবার কণ্ঠে একটিই দাবি, ‘যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’। ‘কাদের মোল্লার এই রায়
আমরা মানি না’।
যাঁরা এত দিন যুদ্ধাপরাধের বিচারকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক এজেন্ডা বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন, যাঁরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করে গলা ফাটিয়েছেন, তাঁদের শাহবাগ মোড়ে তরুণদের ক্ষুব্ধ অথচ আশাদীপ্ত মহাগণজাগরণটি দেখে যাওয়ার অনুরোধ করব। যুদ্ধাপরাধের বিচার কোনো দলের এজেন্ডা নয়, সমগ্র জাতির দাবি। সে দাবি এত দিন মেটাতে পারিনি। এখন সময় এসেছে। বিচারের মান নিয়ে যখন পণ্ডিতেরা কূটতর্কে লিপ্ত, রাজনীতিকেরা নানা হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত তখন তরুণ প্রজন্মই আলোর নিশানা দেখাল, রাজপথে বাজাল অর্ফিয়্যুসের বাঁশের বাঁশরি।
১৯৯২ সালে শহীদজননী জাহানারা ইমাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যে স্থানটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, ২১ বছর পর সেই একই দাবিতে তার পাশেই সমবেত হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ।
গতকাল নগরের সব জনস্রোত এসে মিশেছিল শাহবাগের সড়ক-সংযোগে। রূপসী বাংলা হোটেল থেকে শাপলা চত্বর, সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে মৎস্য ভবন—সর্বত্র মানুষের মিছিল। মায়ের হাত ধরে শিশুসন্তান এসেছে, বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে এসেছে কিশোর পুত্র। এসেছেন শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মী, শিল্পী, কথাসাহিত্যিক, কবি ও সাংবাদিক। এসেছেন রং-তুলির কারিগরেরা। এসেছেন স্বপ্নবান তরুণেরা—যাঁদের শৃঙ্খল ছাড়া হারাবার কিছু নেই, কিন্তু জয় করার জন্য আছে সমগ্র পৃথিবী। এই তরুণেরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। এঁদের কেউ সাংগঠনিক বৃত্তের মানুষ, কেউ কর্মজীবী, কেউ বা বৃত্তের বাইরের মানুষ। প্রত্যেকের দুটি করে হাত এসে মিলেছে শত-সহস্র হাতে। একটি কণ্ঠ মিলেছে লাখো কণ্ঠে ‘যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’। ছোট ছোট মানববৃত্ত তৈরি করেছে মহাসমাবেশ এবং তাতে সব বয়সের সব শ্রেণীর মানুষের সরব উপস্থিতি। এত বড় বিশাল আয়োজন অথচ কোনো নেতা নেই, দল নেই। এই সমাবেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো অধিক সংখ্যায় নারীদের উপস্থিতি। একাত্তরে রাজাকার-আলবদরদের প্রথম ও প্রধান টার্গেটও হয়েছিলেন নারীরা। তাই তাঁরা এগিয়ে আসবেন, সেটাই স্বাভাবিক।
চার দিন ধরে শাহবাগ চত্বর পরিণত হয়েছে ‘বাংলাদেশের তাহরির স্কয়ারে’। তাঁদের মধ্যে হয়তো মত ও পথের ফারাক আছে, চিন্তাচেতনার অমিল আছে। কিন্তু একটি বিষয়ে তাঁরা একমত, ‘যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। কাদের মোল্লার অপরাধ এতই ভয়ংকর যে তাঁর শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে কম কিছু হতে পারে না।’ বজ্রকণ্ঠে তাঁরা উচ্চারণ করেছেন, ‘জেগে ওঠো বাংলাদেশ’।
এই যে চার দিন ধরে শাহবাগ এলাকায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ আছে, শহরের কর্মব্যস্ত মানুষের চলাচলে কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু তাঁরা মেনে নিয়েছেন। তরুণদের কাফেলায় নিজেদের যুক্ত করেছেন। এই তরুণেরাই আমাদের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁরাই ছিলেন ভাষা আন্দোলনের সামনের কাতারে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে কি হবে না, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না, তখন তরুণেরা রাজপথে নেমে এলেন। সৃষ্টি হলো ইতিহাস। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও তাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তাঁরা ছিলেন সরব ও সক্রিয়। তারপর বহুদিন এমন স্বতঃস্ফূর্ত, এমন প্রাণমাতানো দেশ কাঁপানো আন্দোলন আর হয়নি। স্বাধীনতার ৪১ বছর পর তরুণেরা রাজপথে নেমে এলেন ইতিহাসের দায় মেটাতে। অগণিত শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধার প্রতি জাতির দায়। তাঁরা এলেন বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে। এই তরুণদের প্রতি জানাই সালাম, অভিনন্দন।
কেবল ঢাকা নয়, ন্যায়বিচার প্রার্থী বিক্ষুব্ধ মানুষের সমাবেশ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র—চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, রংপুর এমনকি জেলা-উপজেলা পর্যন্ত। গানে, কবিতায়, স্লোগানে, রং-তুলিতে মূর্ত করে তুলেছেন তাঁদের দাবি, তাঁদের আশা ও ভালোবাসার কথা। এসব সমাবেশে যোগদানকারী তরুণেরা আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছেন, ‘একাত্তরের খুনি, ধর্ষক ও লুটেরাদের ক্ষমা নেই’। ‘ওদের বর্জন করো’।
অনেকের অভিযোগ ছিল, আজকের তরুণেরা বড্ড বেশি বিচ্ছিন্ন, বড্ড বেশি ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মশগুল থাকেন। তাঁরা দেশ ও দেশের মানুষ নিয়ে ভাবেন না। অভিযোগ ছিল, তাঁরা রাজনীতিবিমুখ ও সমাজ-বিচ্ছিন্ন। কিন্তু শাহবাগে সমবেত তরুণেরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, প্রবীণ বা পৌঢ়রা ভুল করলেও তরুণেরা ভুল করেন না। তাঁরা কোনো দলবিমুখ হলেও রাজনীতিবিমুখ নন। যুদ্ধাপরাধের বিচার চাওয়া সবচেয়ে বড় রাজনীতি। তাঁরা সেই রাজনীতিকে ঘৃণা করেন যে রাজনীতি রাতের আঁধারে সহপাঠীকে হত্যা করতে, তার হাত ও পায়ের রগ কেটে দিতে উদ্বুদ্ধ করে, তাঁরা সেই রাজনীতিকে ঘৃণা করে যে রাজনীতি মেয়েদের ঘরে বন্দী থাকতে বাধ্য করে, তাঁর সেই রাজনীতি ঘৃণা করে যে রাজনীতি রাস্তায় চাপাতির কোপে নিরীহ তরুণের প্রাণ কেড়ে নেয়। এ ঘটনা প্রমাণ করল, আমাদের তরুণেরা দেশকে ভালোবাসেন, মুক্তিযুদ্ধকে ভালোবাসেন।
শাহবাগে এবং সারা দেশে তারুণ্যের এই দীপ্র জাগরণ এবং তীব্র উচ্চারণ সরকারকে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সেই সত্যটি হলো, কেন যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি হলো না? বিচার-প্রক্রিয়ার কোথায় ভুল ও দুর্বলতা ছিল? আমি সন্দেহবাদীদের মতো এর পেছনে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি খুঁজতে চাই না। মাননীয় বিচারক ও বিচারব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে চাই। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা কী করেছেন? তাঁরা কি যথাযথভাবে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন? করলে বিচারে রায় এমন হলো কেন?
মামলার প্রধান কৌঁসুলি গোলাম আরিফ টিপু স্বীকার করেছেন, ‘আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল, কাদের মোল্লার অপরাধের মাত্রা ও গভীরতা তার চেয়ে অনেক বেশি।’ (প্রথম আলো, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, আযাদের মৃত্যুদণ্ড হলে কাদের মোল্লার শাস্তি যাবজ্জীবন হলো কেন? এ প্রশ্নের সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। বলেছেন, ‘আমরা (প্রসিকিউশন) যথাযথভাবে প্রত্যেকটি অভিযোগ প্রমাণের চেষ্টা করেছি।’ তাঁদের চেষ্টাটি যে যথেষ্ট ছিল না, সেটাই রায়ে প্রতিফলিত হয়েছে। কেবল কাদের মোল্লার মামলায় নয়, অন্যান্য মামলায়ও প্রসিকিউশন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। একাধিকবার তাঁদের অভিযোগপত্র আদালত এই বলে ফিরিয়ে দিয়েছেন যে সেগুলো যথাযথভাবে লেখা হয়নি। একাধিক আইনবিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘এই মামলায় প্রসিকিউশনের (রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী) ব্যর্থতার কারণেই অভিযুক্তকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া যায়নি।’ প্রসিকিউশন কেন আদালতে উপযুক্ত সাক্ষী ও তথ্যপ্রমাণ হাজির করতে পারলেন না? এটি আর পাঁচটি মামলার মতো নয়। গোটা জাতিকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করার অধিকার বা এখতিয়ার কারও নেই।
মামলার শুরু থেকেই একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন আরও অভিজ্ঞ, আরও দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ করার দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু সরকারের নীতিনির্ধারকেরা সে দাবি আমলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। অভিযোগ আছে, জাতীয়ভাবে অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই মামলায় আইনজীবী হিসেবে যাঁদের নেওয়া হয়েছে, তাঁরা আসামিপক্ষকে যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারেননি। আসামি পক্ষের নবীন আইনজীবীরাও তাঁদের চেয়ে সওয়াল জবাবে অনেক চৌকস ছিলেন।
কাদের মোল্লার রায় নিয়ে বিভিন্ন মহল যেসব প্রশ্ন তুলেছে, সরকারকে সেগুলোর সদুত্তর দিতে হবে। কারও একগুঁয়েমি কিংবা নির্বুদ্ধিতার জন্য জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে, সেটি হতে পারে না। এখনো আটটি মামলা রায়ের অপেক্ষায় আছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটির যুক্তিতর্ক ও সাক্ষ্য গ্রহণ এখনো শেষ হয়নি। এরপর আপিলের বিষয় আছে। অতএব, সবটা নিয়েই সরকারকে ভাবতে হবে। বুঝতে হবে জনসমাবেশে গরম বক্তৃতা দেওয়া আর বিচারিক প্রক্রিয়া এক কথা নয়। সরকারের সমর্থক বিজ্ঞ আইনজীবীরা এত দিন কী করেছেন? ফোরামের নেতৃত্ব নিয়ে মারামারি না করে যুদ্ধাপরাধের বিচার-প্রক্রিয়ায় অবদান রাখতে পারতেন।
অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি তাদের রাস্তা ঠিক করে ফেলেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দলটি এখন সরাসরি যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ‘আমরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বাতিলের দাবির সঙ্গে একমত নই’ বলে তরিকুল ইসলাম যে মন্তব্য করেছিলেন, এখন মনে হচ্ছে, সেটি দুর্ঘটনা মাত্র। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে সারা দেশ যখন উত্তাল, তখনই বিএনপি আগামীকাল সেই যুদ্ধাপরাধীদের দলকে নিয়ে সমাবেশের ডাক দিয়েছে। যে ইস্যুটি জাতির অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যে ইস্যুটি নিয়ে সারা দেশ তোলপাড়, সেই ইস্যুতে বিএনপি নীরব, নিষ্ক্রিয় ও ভূমিকাহীন। বিএনপির নেতারা এত দিন বলে আসছিলেন, বিচার স্বচ্ছ ও ন্যায় হতে হবে। কিন্তু সেই স্বচ্ছ ও ন্যায়বিচারের দাবিতে যখন তরুণেরা বিভিন্ন পেশাজীবী-শ্রমজীবীসহ রাস্তায় নেমে আসছেন, তখন বিএনপি একেবারেই লা জবাব। পত্রিকায় দেখলাম, বিএনপির অন্যতম জ্যেষ্ঠ নেতা এম কে আনোয়ার তারুণ্যের এই গণজাগরণকে ‘সাজানো প্রতিবাদ’ বলে অভিহিত করেছেন। এ ধরনের নিষ্ঠুর মন্তব্য তাঁরাই করতে পারেন, যাঁরা যুদ্ধাপরাধীদের আগলে রাখতে চান। তারুণ্যের সাহস ও সততার ওপর এই আঘাত তরুণেরা মেনে নেবেন না।
নব্বইয়ে স্বৈরাচারের পতনের পর এ রকম স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বতঃপ্রণোদিত সমাবেশ আর হয়নি। কোনো নেতার আহ্বান ও দলের আয়োজন ছাড়াই সর্বস্তরের মানুষ ঘর ছেড়ে রাজপথে নেমে এসেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভাবিত ঘটনা। রাজপথে লাখো-কোটি প্রাণের কল্লোল যাঁরা শুনতে পান না, ইতিহাসে তাঁরা নিন্দিত ও কলঙ্কিত হয়েই থাকবেন।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net
যাঁরা এত দিন যুদ্ধাপরাধের বিচারকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক এজেন্ডা বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন, যাঁরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করে গলা ফাটিয়েছেন, তাঁদের শাহবাগ মোড়ে তরুণদের ক্ষুব্ধ অথচ আশাদীপ্ত মহাগণজাগরণটি দেখে যাওয়ার অনুরোধ করব। যুদ্ধাপরাধের বিচার কোনো দলের এজেন্ডা নয়, সমগ্র জাতির দাবি। সে দাবি এত দিন মেটাতে পারিনি। এখন সময় এসেছে। বিচারের মান নিয়ে যখন পণ্ডিতেরা কূটতর্কে লিপ্ত, রাজনীতিকেরা নানা হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত তখন তরুণ প্রজন্মই আলোর নিশানা দেখাল, রাজপথে বাজাল অর্ফিয়্যুসের বাঁশের বাঁশরি।
১৯৯২ সালে শহীদজননী জাহানারা ইমাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যে স্থানটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, ২১ বছর পর সেই একই দাবিতে তার পাশেই সমবেত হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ।
গতকাল নগরের সব জনস্রোত এসে মিশেছিল শাহবাগের সড়ক-সংযোগে। রূপসী বাংলা হোটেল থেকে শাপলা চত্বর, সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে মৎস্য ভবন—সর্বত্র মানুষের মিছিল। মায়ের হাত ধরে শিশুসন্তান এসেছে, বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে এসেছে কিশোর পুত্র। এসেছেন শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মী, শিল্পী, কথাসাহিত্যিক, কবি ও সাংবাদিক। এসেছেন রং-তুলির কারিগরেরা। এসেছেন স্বপ্নবান তরুণেরা—যাঁদের শৃঙ্খল ছাড়া হারাবার কিছু নেই, কিন্তু জয় করার জন্য আছে সমগ্র পৃথিবী। এই তরুণেরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। এঁদের কেউ সাংগঠনিক বৃত্তের মানুষ, কেউ কর্মজীবী, কেউ বা বৃত্তের বাইরের মানুষ। প্রত্যেকের দুটি করে হাত এসে মিলেছে শত-সহস্র হাতে। একটি কণ্ঠ মিলেছে লাখো কণ্ঠে ‘যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’। ছোট ছোট মানববৃত্ত তৈরি করেছে মহাসমাবেশ এবং তাতে সব বয়সের সব শ্রেণীর মানুষের সরব উপস্থিতি। এত বড় বিশাল আয়োজন অথচ কোনো নেতা নেই, দল নেই। এই সমাবেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো অধিক সংখ্যায় নারীদের উপস্থিতি। একাত্তরে রাজাকার-আলবদরদের প্রথম ও প্রধান টার্গেটও হয়েছিলেন নারীরা। তাই তাঁরা এগিয়ে আসবেন, সেটাই স্বাভাবিক।
চার দিন ধরে শাহবাগ চত্বর পরিণত হয়েছে ‘বাংলাদেশের তাহরির স্কয়ারে’। তাঁদের মধ্যে হয়তো মত ও পথের ফারাক আছে, চিন্তাচেতনার অমিল আছে। কিন্তু একটি বিষয়ে তাঁরা একমত, ‘যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। কাদের মোল্লার অপরাধ এতই ভয়ংকর যে তাঁর শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে কম কিছু হতে পারে না।’ বজ্রকণ্ঠে তাঁরা উচ্চারণ করেছেন, ‘জেগে ওঠো বাংলাদেশ’।
এই যে চার দিন ধরে শাহবাগ এলাকায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ আছে, শহরের কর্মব্যস্ত মানুষের চলাচলে কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু তাঁরা মেনে নিয়েছেন। তরুণদের কাফেলায় নিজেদের যুক্ত করেছেন। এই তরুণেরাই আমাদের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁরাই ছিলেন ভাষা আন্দোলনের সামনের কাতারে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে কি হবে না, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না, তখন তরুণেরা রাজপথে নেমে এলেন। সৃষ্টি হলো ইতিহাস। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও তাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তাঁরা ছিলেন সরব ও সক্রিয়। তারপর বহুদিন এমন স্বতঃস্ফূর্ত, এমন প্রাণমাতানো দেশ কাঁপানো আন্দোলন আর হয়নি। স্বাধীনতার ৪১ বছর পর তরুণেরা রাজপথে নেমে এলেন ইতিহাসের দায় মেটাতে। অগণিত শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধার প্রতি জাতির দায়। তাঁরা এলেন বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে। এই তরুণদের প্রতি জানাই সালাম, অভিনন্দন।
কেবল ঢাকা নয়, ন্যায়বিচার প্রার্থী বিক্ষুব্ধ মানুষের সমাবেশ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র—চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, রংপুর এমনকি জেলা-উপজেলা পর্যন্ত। গানে, কবিতায়, স্লোগানে, রং-তুলিতে মূর্ত করে তুলেছেন তাঁদের দাবি, তাঁদের আশা ও ভালোবাসার কথা। এসব সমাবেশে যোগদানকারী তরুণেরা আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছেন, ‘একাত্তরের খুনি, ধর্ষক ও লুটেরাদের ক্ষমা নেই’। ‘ওদের বর্জন করো’।
অনেকের অভিযোগ ছিল, আজকের তরুণেরা বড্ড বেশি বিচ্ছিন্ন, বড্ড বেশি ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মশগুল থাকেন। তাঁরা দেশ ও দেশের মানুষ নিয়ে ভাবেন না। অভিযোগ ছিল, তাঁরা রাজনীতিবিমুখ ও সমাজ-বিচ্ছিন্ন। কিন্তু শাহবাগে সমবেত তরুণেরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, প্রবীণ বা পৌঢ়রা ভুল করলেও তরুণেরা ভুল করেন না। তাঁরা কোনো দলবিমুখ হলেও রাজনীতিবিমুখ নন। যুদ্ধাপরাধের বিচার চাওয়া সবচেয়ে বড় রাজনীতি। তাঁরা সেই রাজনীতিকে ঘৃণা করেন যে রাজনীতি রাতের আঁধারে সহপাঠীকে হত্যা করতে, তার হাত ও পায়ের রগ কেটে দিতে উদ্বুদ্ধ করে, তাঁরা সেই রাজনীতিকে ঘৃণা করে যে রাজনীতি মেয়েদের ঘরে বন্দী থাকতে বাধ্য করে, তাঁর সেই রাজনীতি ঘৃণা করে যে রাজনীতি রাস্তায় চাপাতির কোপে নিরীহ তরুণের প্রাণ কেড়ে নেয়। এ ঘটনা প্রমাণ করল, আমাদের তরুণেরা দেশকে ভালোবাসেন, মুক্তিযুদ্ধকে ভালোবাসেন।
শাহবাগে এবং সারা দেশে তারুণ্যের এই দীপ্র জাগরণ এবং তীব্র উচ্চারণ সরকারকে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সেই সত্যটি হলো, কেন যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি হলো না? বিচার-প্রক্রিয়ার কোথায় ভুল ও দুর্বলতা ছিল? আমি সন্দেহবাদীদের মতো এর পেছনে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি খুঁজতে চাই না। মাননীয় বিচারক ও বিচারব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে চাই। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা কী করেছেন? তাঁরা কি যথাযথভাবে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন? করলে বিচারে রায় এমন হলো কেন?
মামলার প্রধান কৌঁসুলি গোলাম আরিফ টিপু স্বীকার করেছেন, ‘আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল, কাদের মোল্লার অপরাধের মাত্রা ও গভীরতা তার চেয়ে অনেক বেশি।’ (প্রথম আলো, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, আযাদের মৃত্যুদণ্ড হলে কাদের মোল্লার শাস্তি যাবজ্জীবন হলো কেন? এ প্রশ্নের সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। বলেছেন, ‘আমরা (প্রসিকিউশন) যথাযথভাবে প্রত্যেকটি অভিযোগ প্রমাণের চেষ্টা করেছি।’ তাঁদের চেষ্টাটি যে যথেষ্ট ছিল না, সেটাই রায়ে প্রতিফলিত হয়েছে। কেবল কাদের মোল্লার মামলায় নয়, অন্যান্য মামলায়ও প্রসিকিউশন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। একাধিকবার তাঁদের অভিযোগপত্র আদালত এই বলে ফিরিয়ে দিয়েছেন যে সেগুলো যথাযথভাবে লেখা হয়নি। একাধিক আইনবিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘এই মামলায় প্রসিকিউশনের (রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী) ব্যর্থতার কারণেই অভিযুক্তকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া যায়নি।’ প্রসিকিউশন কেন আদালতে উপযুক্ত সাক্ষী ও তথ্যপ্রমাণ হাজির করতে পারলেন না? এটি আর পাঁচটি মামলার মতো নয়। গোটা জাতিকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করার অধিকার বা এখতিয়ার কারও নেই।
মামলার শুরু থেকেই একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন আরও অভিজ্ঞ, আরও দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ করার দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু সরকারের নীতিনির্ধারকেরা সে দাবি আমলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। অভিযোগ আছে, জাতীয়ভাবে অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই মামলায় আইনজীবী হিসেবে যাঁদের নেওয়া হয়েছে, তাঁরা আসামিপক্ষকে যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারেননি। আসামি পক্ষের নবীন আইনজীবীরাও তাঁদের চেয়ে সওয়াল জবাবে অনেক চৌকস ছিলেন।
কাদের মোল্লার রায় নিয়ে বিভিন্ন মহল যেসব প্রশ্ন তুলেছে, সরকারকে সেগুলোর সদুত্তর দিতে হবে। কারও একগুঁয়েমি কিংবা নির্বুদ্ধিতার জন্য জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে, সেটি হতে পারে না। এখনো আটটি মামলা রায়ের অপেক্ষায় আছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটির যুক্তিতর্ক ও সাক্ষ্য গ্রহণ এখনো শেষ হয়নি। এরপর আপিলের বিষয় আছে। অতএব, সবটা নিয়েই সরকারকে ভাবতে হবে। বুঝতে হবে জনসমাবেশে গরম বক্তৃতা দেওয়া আর বিচারিক প্রক্রিয়া এক কথা নয়। সরকারের সমর্থক বিজ্ঞ আইনজীবীরা এত দিন কী করেছেন? ফোরামের নেতৃত্ব নিয়ে মারামারি না করে যুদ্ধাপরাধের বিচার-প্রক্রিয়ায় অবদান রাখতে পারতেন।
অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি তাদের রাস্তা ঠিক করে ফেলেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দলটি এখন সরাসরি যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ‘আমরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বাতিলের দাবির সঙ্গে একমত নই’ বলে তরিকুল ইসলাম যে মন্তব্য করেছিলেন, এখন মনে হচ্ছে, সেটি দুর্ঘটনা মাত্র। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে সারা দেশ যখন উত্তাল, তখনই বিএনপি আগামীকাল সেই যুদ্ধাপরাধীদের দলকে নিয়ে সমাবেশের ডাক দিয়েছে। যে ইস্যুটি জাতির অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যে ইস্যুটি নিয়ে সারা দেশ তোলপাড়, সেই ইস্যুতে বিএনপি নীরব, নিষ্ক্রিয় ও ভূমিকাহীন। বিএনপির নেতারা এত দিন বলে আসছিলেন, বিচার স্বচ্ছ ও ন্যায় হতে হবে। কিন্তু সেই স্বচ্ছ ও ন্যায়বিচারের দাবিতে যখন তরুণেরা বিভিন্ন পেশাজীবী-শ্রমজীবীসহ রাস্তায় নেমে আসছেন, তখন বিএনপি একেবারেই লা জবাব। পত্রিকায় দেখলাম, বিএনপির অন্যতম জ্যেষ্ঠ নেতা এম কে আনোয়ার তারুণ্যের এই গণজাগরণকে ‘সাজানো প্রতিবাদ’ বলে অভিহিত করেছেন। এ ধরনের নিষ্ঠুর মন্তব্য তাঁরাই করতে পারেন, যাঁরা যুদ্ধাপরাধীদের আগলে রাখতে চান। তারুণ্যের সাহস ও সততার ওপর এই আঘাত তরুণেরা মেনে নেবেন না।
নব্বইয়ে স্বৈরাচারের পতনের পর এ রকম স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বতঃপ্রণোদিত সমাবেশ আর হয়নি। কোনো নেতার আহ্বান ও দলের আয়োজন ছাড়াই সর্বস্তরের মানুষ ঘর ছেড়ে রাজপথে নেমে এসেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভাবিত ঘটনা। রাজপথে লাখো-কোটি প্রাণের কল্লোল যাঁরা শুনতে পান না, ইতিহাসে তাঁরা নিন্দিত ও কলঙ্কিত হয়েই থাকবেন।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net
Comments
Post a Comment