শাহবাগ চত্বর এখন আলোর মোহনা



শাহবাগ চত্বর এখন আলোর মোহনা। চারদিকে চার রাস্তা। মত্স্য ভবন, এলিফেন্ট রোড, বাংলামোটর ও টিএসসির ঠিক মাঝখানে প্রজন্ম চত্বরের মূল মঞ্চ। চার রাস্তাজুড়ে জ্বলছে মোমবাতি। মোমবাতি দিয়ে লেখা হয়েছে ‘৭১’। মোমবাতি জ্বালিয়ে আজ শুরু হয়েছে শাহবাগের রাতের কর্মসূচি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার সামনে টাঙানো হয়েছে প্রায় ১০০ মিটারের মতো লম্বা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। ‘৭১’-কে যেন ধারণ করে আছে ওই পতাকা। স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতাকে। পতাকার পাশেই চলছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নাটক আর গানের মধ্য দিয়ে চলছে প্রতিবাদ।

কাদের মোল্লাসহ একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে সর্বস্তরের মানুষের অবস্থানের পঞ্চম দিন আজ। সেখানে অনেকে আছেন যাঁরা এই ফাঁসির দাবিতে এসে আর ঘরমুখো হননি। নাওয়া-খাওয়া ভুলে শাহবাগে পড়ে আছেন দাবির প্রতি অনড় হয়ে।
আজ বেলা বেড়েছে, সময় পেরিয়েছে কিন্তু ক্লান্তি আসেনি। লোকসমাগম বাড়ছেই। ফুঁসছে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস। তাঁদের সঙ্গে অন্যদের মিলনমালায় তৈরি হয়েছে বিশাল এক গণজোয়ার। এতে যেন একাত্তরের সেই গণজাগরণেরই প্রতিধ্বনি।

নানা স্লোগানে মুখরিত শাহবাগ
শাহবাগে এসেছেন ছোট্ট সন্তান কোলে বাবা-মা। নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের মুখে ধ্বনিত হচ্ছে ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’; ‘একাত্তরের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’; ‘সাম্প্রদায়িকতার আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’; ‘জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো’; ‘পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা, পাকিস্তানেই ফিরে যা’; ‘বাংলাদেশের মাটিতে জামায়াত-শিবিরের ঠাঁই নাই’; ‘আমাদের ধমনিতে শহীদের রক্ত, এই রক্ত কোনো দিনও বৃথা যেতে দেব না’; ‘আর কোনো দাবি নাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই’; ‘জামায়াতে ইসলাম, মেড ইন পাকিস্তান’; ‘এসো ভাই এসো বোন, গড়ে তুলি আন্দোলন’, ‘জয় বাংলা’—এসব স্লোগান।
আজ বারবার উচ্চারিত হচ্ছে ‘সারা বাংলার মোহনা, শাহবাগ শাহবাগ’; ‘রক্ত দেব, জীবন দেব, রাজাকারদের ফাঁসি দেব’ স্লোগানগুলো।
তবে সবচেয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে ‘ক-তে কাদের মোল্লা, তুই রাজাকার তুই রাজাকার’; ‘ক-তে কামারুজ্জামান, তুই রাজাকার তুই রাজাকার’; ‘গ-তে গোলাম আযম, তুই রাজাকার তুই রাজাকার’; ‘স-তে সাকা, তুই রাজাকার তুই রাজাকার’; ‘ম-তে মুজাহিদ, তুই রাজাকার তুই রাজাকার’; ‘ন-তে নিজামী, তুই রাজাকার তুই রাজাকার’; ‘স-তে সাঈদী, তুই রাজাকার তুই রাজাকার’।

বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সংহতি প্রকাশ
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ও বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রফিক উল্লাহ খান শাহবাগে আন্দোলনরত জনতার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশের তরুণসমাজ দেশকে ভালোবেসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে যে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তার জন্য তাদের সশ্রদ্ধ অভিবাদন। তরুণসমাজ অন্তরের সৌন্দর্য ও শক্তি দিয়ে যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, তা শ্রদ্ধার যোগ্য। বাংলাদেশের মানুষ তরুণদের দিকে তাকিয়ে থাকবে, সমস্ত অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য।’
অধ্যাপক রফিক উল্লাহ খান বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান “জয় বাংলা” আজ সমগ্র জাতির স্লোগানে পরিণত করেছে তরুণেরা। তরুণদের কাছে মাথা নত করি। যা কিছু সম্ভাবনা, তার সবকিছু তরুণদের মধ্যে নিহিত।’ তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, বাংলাদেশের মাটিতে কোনো যুদ্ধাপরাধী থাকবে না, কোনো রাজাকার থাকবে না। এখানে থাকবে শুধু “জয় বাংলা” স্লোগান; অন্য কোনো স্লোগান নয়।’
আজ সকালে ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের দল শাহবাগের তারুণ্যের দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিত্সকেরাও এর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের একদল শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে শাহবাগের সমাবেশে যোগ দিয়েছেন।

লড়াই চলবে
গতকাল লাখো জনতার মহাসমুদ্রের কেন্দ্রবিন্দু শাহবাগের ‘প্রজন্ম চত্বরের’ নবজাগরণ মঞ্চ থেকে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন সাজার রায় প্রত্যাখ্যান করে গত মঙ্গলবার বিকেলে শাহবাগ মোড়ে এই বিক্ষোভের সূচনা করে ব্লগার ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ফোরাম। এরপর বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা এ আন্দোলনে যোগ দেন।

Comments

Popular posts from this blog

যুদ্ধাপরাধের বিচার: জাতি কি এই রায়ের জন্য অপেক্ষা করেছিল?

ঈদের পর নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল, জামায়াতের হরতাল